কেন অনেক পুরুষ এক সময় নিজের স্ত্রীকে আর ভালোবাসতে পারে না? – ইসলামের আলোকে বাস্তব একটি শিক্ষা।

কেন অনেক পুরুষ স্ত্রীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে?

বর্তমান সমাজে একটি বিষয় খুবই সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে—অনেক পুরুষই কিছু বছর সংসার করার পর নিজের স্ত্রীর প্রতি আগের মতো আকর্ষণ অনুভব করে না।

বিয়ের শুরুতে যে মানুষটিকে সবচেয়ে সুন্দর মনে হতো, সময়ের সাথে সাথে তাকে আর আগের মতো ভালো লাগে না। অনেক সময় স্বামীরা বাসায় ফিরতে দেরি করে, অযথা বাইরে সময় কাটায়, কিংবা স্ত্রীর সাথে কথা বলতেও অনীহা প্রকাশ করে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটা কি সত্যিই স্বাভাবিক? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?

এই বিষয়টি বোঝার জন্য একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার গল্প শোনা যাক।

একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা

আমার স্ত্রী দেখতে সুন্দর। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সংসারও মোটামুটি ভালোই চলছে। আমাদের বিয়ের বয়স প্রায় আট বছর। পাঁচ বছরের একটি কন্যা সন্তানও আছে।

কিন্তু কিছুদিন ধরে আমি লক্ষ্য করছি, আমার ভেতরে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে।অফিস শেষ হওয়ার পর সরাসরি বাসায় যেতে ইচ্ছে করে না। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে চলে যাই। কখনো কখনো রাত করেও বাসায় ফিরি। অথচ এক সময় এমন ছিল না।

বিয়ের শুরুর দিনগুলোতে অফিস শেষ হলেই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে মন চাইতো। মনে হতো কেউ একজন অপেক্ষা করছে আমার জন্য। ছুটে যেতাম স্ত্রীর কাছে। ছুটির দিন হলে তো কথাই নেই—সারাদিন ঘরে থাকতাম, তাকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম, গল্প করতাম। তাকে দেখলেই মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষ সে।

কিন্তু এখন সবকিছু যেন বদলে গেছে। স্ত্রীর দিকে তাকাতে ভালো লাগে না। কথা বলতে ইচ্ছে করে না। সে পাশে থাকলে কখনো কখনো বিরক্ত লাগে। বাইরে থাকলে তার ফোন ধরতেও ইচ্ছে করে না। এমনকি রাতের বেলা সে কাছে এলে আমি অজুহাত দিই— “জ্বালাতন করো না, সারাদিন অফিস করে খুব ক্লান্ত। ঘুমাতে দাও।”

বাস্তবে ক্লান্তি নয়, সমস্যাটা অন্য জায়গায়। আসলে আমার নিজের স্ত্রীকেই আর আগের মতো ভালো লাগে না।

আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম—এমন কেন হচ্ছে?

আমি অনেক পরিচিত পুরুষের সাথে কথা বললাম। তাদের অধিকাংশই একই কথা বললো—
“এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। এক জিনিস কি আর সবসময় ভালো লাগে?”

কিন্তু তাদের উত্তর আমার মনকে শান্ত করতে পারলো না।

আমার মনে প্রশ্ন জাগলো—
এটা কি কোনো মানসিক সমস্যা?
ডাক্তার দেখালে কি সমাধান পাওয়া যাবে?

অবশেষে একদিন দ্বিধা নিয়ে গোপনে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলাম। সব কথা মন খুলে বললাম।ডাক্তার মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। তারপর তিনি আমাকে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন—

“আপনি কি আল্লাহকে বিশ্বাস করেন?”

আমি বললাম, “জি, করি।” ডাক্তার বললেন, “তাহলে আমি আপনাকে আল্লাহর একটি নির্দেশ মনে করিয়ে দিতে চাই। যদি আপনি এটি ঠিকভাবে পালন করতে পারেন, ইনশাআল্লাহ আপনার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কোনো ওষুধ লাগবে না।”

আমি অবাক হয়ে বললাম,
“কোন নির্দেশ?”

তিনি বললেন—

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন: Qur’an, Surah An‑Nur:“হে নবী! মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটিই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।”

ডাক্তার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন—

“আপনি শুধু এক মাস এই নির্দেশ মেনে চলুন। চোখকে নিয়ন্ত্রণ করুন, হারাম জিনিস থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। তারপর দেখুন কী পরিবর্তন হয়।”

আমি কিছুটা সন্দেহ নিয়ে বললাম—
“এতেই কি সত্যি কাজ হবে?”

ডাক্তার হেসে বললেন—“অবশ্যই হবে। তবে শর্ত হলো—আপনাকে পুরো এক মাস কোনো ফাঁকি ছাড়া এই নির্দেশ মেনে চলতে হবে।” চেম্বার থেকে বের হওয়ার সময় দেখলাম এক যুবতী সুন্দরী মেয়ে একজন বৃদ্ধাকে নিয়ে ভেতরে ঢুকছে। স্বাভাবিকভাবেই চোখ তার দিকে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ ডাক্তারের কথা মনে পড়ে গেল। আমি দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম।

সেদিন থেকেই শুরু হলো আমার দৃষ্টি সংযমের চেষ্টা। রাস্তা-ঘাটে কোনো নারীর দিকে চোখ পড়লে সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলতাম। মাথা নিচু করে হাঁটতাম। প্রথম দুই দিন খুব অস্বস্তি লাগলো। মনে হচ্ছিল ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।

একদিন সেই অস্থিরতা কমানোর জন্য মোবাইল হাতে নিলাম। ভাবলাম পর্নোগ্রাফি দেখে নিজেকে শান্ত করবো।গুগলে সার্চ দিতে যাবো—ঠিক তখনই আবার আল্লাহর সেই নির্দেশ মনে পড়ে গেল।আমি সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল রেখে দিলাম। নিজেকে বললাম—না, এটা করবো না। এভাবে ধীরে ধীরে কয়েকদিন কেটে গেল।

প্রায় পনেরো দিন পর হঠাৎ একটা আশ্চর্য বিষয় লক্ষ্য করলাম, আমার মাথায় সারাক্ষণ শুধু আমার স্ত্রীর কথাই ঘুরছে। তার হাসি, তার কথা, তার উপস্থিতি—সবকিছু আবার মনে পড়তে লাগলো।

সেদিন অফিস শেষ হতেই আমি যেন উন্মাদের মতো বাসার দিকে দৌড়ালাম। বাড়িতে ঢুকেই জোরে ডাকলাম—“এষা! কোথায় তুমি?” স্ত্রী রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এলো। অবাক হয়ে বললো—

“কি হয়েছে? এত জোরে ডাকছো কেন?” আমি কোনো উত্তর দিলাম না। অফিস ব্যাগটা পাশে রেখে হঠাৎ তাকে কোলে তুলে নিলাম। সে লজ্জা পেয়ে বললো—“এই কি করছো! মেয়েটা ঘুমাচ্ছে, জেগে যাবে।”

আমি শুধু বলছিলাম—“ভালোবাসি তোমাকে… অনেক ভালোবাসি।”

পরদিন আমি আবার সেই ডাক্তারের কাছে গেলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন—
“এখনো তো এক মাস শেষ হয়নি! ”আমি হেসে বললাম—“ডাক্তার সাহেব, আমার সমস্যা তো ইতিমধ্যেই দূর হয়ে গেছে।”

ডাক্তার মুচকি হেসে বললেন—“আলহামদুলিল্লাহ। আপনার সংসারের জন্য আমার আন্তরিক দোয়া রইলো।” চেম্বার থেকে বের হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম—“ধন্যবাদ আল্লাহ। আপনার নির্দেশের মধ্যেই সব সমাধান।”

শেষ কথাঃ

বাস্তবতা হলো—আজকের যুগে অনেক পুরুষই অজান্তেই দৃষ্টির অপব্যবহার করে। সোশ্যাল মিডিয়া, সিনেমা, অশ্লীল কনটেন্ট—এসব ধীরে ধীরে মানুষের মনকে পরিবর্তন করে দেয়। ফলে নিজের স্ত্রীকে আর আকর্ষণীয় মনে হয় না।

কিন্তু যখন একজন মানুষ আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী দৃষ্টি সংযম করে, তখন তার হৃদয় আবার পবিত্র হয়ে ওঠে। তখন সে বুঝতে পারে—তার নিজের স্ত্রীই তার জন্য সবচেয়ে সুন্দর ও হালাল ভালোবাসা।

এই শিক্ষাটি শুধু একজন মানুষের নয়—সমাজের অসংখ্য পরিবারের জন্য প্রযোজ্য।

Leave a Comment